ইবাদতের অন্তরালে প্রণয়

0
250

বিস্তীর্ণ খেজুর বাগানের পাশেই খেজুর পাতায় তৈরি মসজিদ… রমজান শুরুর আগের বিকেল, মসজিদে সমবেত হয়েছে বিভিন্ন বর্ণ ও জাতির জনা কয়েক মুসাফির ও সুফি- সেই সব মুসাফির ও সুফির ভেতরে এক পাগল প্রেমিকও রয়েছেন। পাগড়ি পরিহিত ইমাম মাসজিন, সকলের উদ্দেশ্যে কাঠের মিম্বরে দাঁড়িয়ে, ঐশী গ্রন্থ ও হাদীস থেকে পাঠ করছেন রোজা সম্পর্কিত পবিত্র বাণীসমূহ; পাগল প্রেমিকের চোখ ইমামের ঠোঁটের দিকে একবারেরও জন্যে স্থির হয়নি- কেন না তার চোখে জ্বলজ্বল করছিল দূর ভূমির এক নারীর খেজুর পাতা দিয়ে বানানো নৌকা, হৃদয় আকৃতির ভালোবাসা ও শুকতারা; পাগল প্রেমিকের কান জোড়া ইমাম কর্তৃক উচ্চারিত বাণীর কিছুই শুনেনি, শুধু শুনেছে- ইফতার সামনে রেখে স্রষ্টার নিকটে হৃদয়ের গহীন থেকে কিছু আবদার করলে, স্রষ্টা তা কবুল করে নেন।

সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত অবধি অবিরাম ঝড়ো বৃষ্টি হলো, ঝড়ো বৃষ্টি শেষে পাগল প্রেমিক ঘরের দুয়ার খুলে গৃহপ্রাঙ্গণে গেলেন, পায়চারি করতে করতে মেঘ মুক্ত আকাশে তার দৃষ্টি নিবন্ধিত হলো। ঝড় পরবর্তী তারকা খচিত আকাশ দেখে উন্মাদ প্রেমিকের বুকে আশা ও স্বপ্নের বীজ প্রোথিত হলো; প্রেমিক আকাশের পানে মুখ তুলে প্রার্থনা করলেন- “হে প্রতিপালক এই ঝড় পরবর্তী আকাশ আমার মনের হতাশা, বিষণ্নতা দূর করে দিয়ে, এক নতুন স্বপ্নের পিদিম জ্বালিয়ে দিয়েছে আমার চোখে; হে স্রষ্টা মানুষের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে এই পৃথিবী, আকাশ ও মাটি- আকাশ ও জমিনের মাঝে যা কিছু রয়েছে, তার সবকিছুই মানুষের জন্যে নিবেদিত; সেই সমস্ত কিছুর ভেতর থেকে তোমার এই বান্দাকে কেবল সেই নারীকেই দাও, যে এখন রয়েছে জেগে দূর ভূমির গাছগাছালি পরিবেষ্টিত নিভৃত এক গৃহে।”

প্রেমিক বান্দা ঘরে ফিরে এলেন, আর রাত ভর সেই নারীকে ভাবতে লাগলেন যাকে সে ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে দিয়েছে একটি নাম। এক সময় সেহেরির সময় হলো, অতঃপর সেহেরি খেয়ে প্রেমিক বান্দা প্রথমে স্রষ্টা ও পরে প্রেমিকার নাম স্মরণ করে চোখকে প্রশান্তি দিতে ঘুমের জগতের বাসিন্দা হলেন। ঘুম থেকে উঠে দেখলেন, সে যেই নারীকে ভালোবাসে তার থেকে একটি চিঠি এসেছে; চিঠিতে লেখা, “এই! আছেন আপনি? শুনেন তবে… একজন তার প্রেমিকাকে আমার কাছে আমানত হিসেবে গচ্ছিত রাখতে চাচ্ছে, আমার মায়া হয়েছে তাদের জন্যে। আপনার পরামর্শ কী!”

চিঠিটি পড়া শেষে পাগল প্রেমিক হাসলেন, শূন্যতাকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করলেন- “যে নারী আরেকজনের প্রেমিকাকে আমানত হিসেবে রাখার মতো মায়া-মহব্বত পুষে হৃদয়ে, সে নারী কি আমার অসীম ও পবিত্র নিয়তের ভালোবাসাকেও আত্মায় করছে লালন?” উদ্বিগ্নতা নিয়ে পাগল বান্দা হাঁটতে লাগলেন খেজুর বাগানের দিকে- কিছু পক্ব খেজুর সংগ্রহ করে, কুয়ো থেকে নিলেন এক মশক পানি… এরপরে সব নিয়ে বাগানের শেষ সীমান্তে খেজুর পাতার ডাল বিছিয়ে বসলেন পাগল বান্দা, অতঃপর খেজুর ও মশক ভর্তি পানি সামনে নিয়ে মোনাজাত ধরলেন এই বলে- “হে আমার রব, আমি যেই নারীকে এখন স্মরণ করছি, আমি জানি সে আমাকে স্মরণ করছে না। সে জানছেও না ইফতার সামনে রেখে তাকেই চাইছি আমি সমস্ত জীবনের জন্যে, সে জানছেও না আমার এই মুহূর্তগুলি কাটছে তারই প্রেমে মগ্ন হয়ে, সে জানছেও না তার মুখের ভেতরই এই মুনাজাতে আমি করছি অন্বেষণ আমার পরবর্তী প্রজন্মের মুখাবয়ব। হে বিশ্বজগতের প্রতিপালক, আমার এই রোজায় যদি ন্যূনতম পূণ্যও হয়, তবে সে পূণ্যের উছিলায় আপনি তাকে আমার ভাগ্যের সাথে জুড়ে দেন।”

আল-আরশে বসে স্রষ্টা প্রশ্ন করলেন নূরের তৈরি ফেরেশতাকে, “কে এই বান্দা, কীসের জন্য তার চোখে জল, কেন সে আমার নিয়ামত পাকা খেজুর ও সুমিষ্ট পানি সামনে রেখেও আহাজারি করছে?” প্রত্যুত্তরে ফেরেশতা বললেন- “এই পাগল বান্দা আপনার সৃষ্টি এক নারীকে ভালোবাসে, যার গৃহে সন্ধ্যাকালে ফিরে আসে কবুতরের দল; তার চোখের বর্ষণ চায় যাতে সেই নারীকে আপনি তার হৃদয় উপাসনালয়ের শাহজাদি করে দেন।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here