বিকেলটা প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। সন্ধ্যার আবছা আলো একটু পরেই ছড়িয়ে পড়বে চারপাশে। উদাস হয়ে রাস্তার ধারে একা একা বসে আছে অনন্ত, মনটা ভালো নেই। বাড়িতে অসুস্থ মায়ের অসহায় করুণ মুখ প্রতিদিন দেখতে দেখতে হাঁপিয়ে উঠেছে ও। বাবা গত হয়েছেন প্রায় বছর দুয়েক হলো। পরিবারের সকল দায়িত্বই এখন ওর কাঁধে। অনার্স শেষ করে বছরখানেক হলো বসে আছে, কিন্তু কোথাও কোনো চাকরির ব্যবস্থা হচ্ছে না। দেখতে দেখতে ছোট বোনটাও বড় হয়ে যাচ্ছে। সামনের বছর মাধ্যমিক দেবে। ওর লেখাপড়ার খরচ, মায়ের ঔষধ কেনা, সংসারের খরচসহ খুঁটিনাটি সকল কিছুই সামলাতে হয় অনন্তকেই। আর এ সবই চলে ওর টিউশনির টাকায়। সারাদিন এদিক ওদিক টিউশনি করে, এর ফাঁকে ফাঁকে চলে চাকরির জন্য আপ্রাণ চেষ্টা। কিন্তু চাকরি নামক সেই সোনার হরিণের দেখা কিছুতেই মিলছে না।

মাঝেমধ্যেই মা এসে জিজ্ঞেস করে, “চাকরি বাকরি কিছু হলো রে বাবা? টিউশনি করে আর কতদিন!” মায়ের এইসব প্রশ্নের উত্তরে, মাথা নিচু করে ঘরে ফিরে যাওয়া ছাড়া ওর মুখে কোনো জবাব থাকে না। এইসব এলোমেলো ভাবনায় কেটে যায় বেশ কিছুক্ষণ। ততক্ষণে প্রায় সন্ধ্যা। দূর থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝি পোকার ডাক। আর দেরি না করে উঠে পড়ে ও, বাড়িতে অসুস্থ মা, দুশ্চিন্তা করবে।

গ্রামে বৈশাখী মেলা বসেছে, চারপাশে রং বেরঙের সাজ আর অসংখ্য মানুষের সমাগম। বন্ধুদের সাথে অনন্ত মেলায় এসেছে। এদিক ওদিক বেশ কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরির পর অনন্ত কিছু জিলাপি আর ঝালমুড়ি কেনে। ছোটবোন আর মায়ের জন্য। ঝালমুড়ি না নিয়ে গেলে ছোটবোন সাবিত্রী ভীষণ মন খারাপ করবে। আর জিলাপি ওর মায়ের ভীষণ পছন্দ। সন্ধ্যা হয়ে এলে ওরা বন্ধুরা যে যার মতো বাড়ির উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়।

একটু এগিয়েই রিকশা স্ট্যান্ড। অনন্ত ওখানে গিয়ে দাঁড়ায় কিন্তু কোনো খালি রিকশা নেই। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর একটি খালি রিকশা পায়, “কাকা, যাবেন নাকি?”
– কোথায় যাবেন?
– মুকুলতলা গ্রাম
– আচ্ছা চলেন।

অনন্ত রিকশায় উঠতে যাচ্ছে, এমন সময় বলা কওয়া নেই কোথা থেকে যেন এক সুন্দরী রমনী রিকশায় উঠে পড়ে, তারপর বলে, “চলুন কাকা। ওই সামনের দিকে চলুন।”

রিকশাওয়ালা বেচারা তো তাজ্জব বনে যায়। তাজ্জব হয়ে তাকিয়ে থাকে অনন্তও। এতো কষ্ট করে রিকশাটা ধরলো অথচ উঠে পড়লো আরেকজন!

রিকশাওয়ালা বলে – রিকশাটা তো উনি ভাড়া করেছেন মা, আপনি বরং অন্য রিকশায় চলে যান।
মেয়েটি বলে – কিন্তু উঠেছি তো আমিই আগে। তাছাড়া উনি যা দেবেন তার চেয়ে বেশি দেবো আমি। চলুন তো, তাড়া আছে আমার। সামনে আমার দাদা অপেক্ষা করছে।
অনন্ত বলে – ওটা তো আমি ঠিক করেছি আগে। সুতরাং আপনার নেমে যাওয়া উচিত।
অহংকারী দৃষ্টিতে তাকায় মেয়েটি, দেখেন, তর্ক করবেন না। আমি আগে উঠেছি, সুতরাং আমিই যাবো।
অনন্ত বলে – তর্ক আপনিই করছেন। দেখুন, আমি সত্যিই চাই না কাউকে অপমান করে রিকশা থেকে নামিয়ে দিই। ভালোয় ভালোয় নেমে যাওয়াটাই উচিত হবে আপনার।
বেশ অপমান বোধ করে মেয়েটি, মেয়েদেরকে কিভাবে সম্মান করতে হয়, জানেন না? অভদ্র কোথাকার! আমি রিকশা ছাড়বো না, দেখি আপনি কী করতে পারেন।
সরলভাবে হাসে অনন্ত, প্রথমত না বলে রিকশায় উঠে অভদ্রতা করেছেন, দ্বিতীয়ত গায়ে পড়ে ঝগড়া করছেন। এছাড়াও আপনি টাকার অহংকার দেখিয়ে বলেছেন, আমার চেয়ে বেশি ভাড়া দেবেন। তাই আপনার সাথে ভদ্রভাবে কথা বলার প্রশ্নই ওঠে না। যাই হোক, এতো তর্ক করতে ভালো লাগছে না, রিকশাটা আপনিই নিয়ে যান। আমার কথায় যদি কোনো দুঃখ পেয়ে থাকেন, প্লিজ মাফ করে দেবেন। আর একটি কথা, মানুষকে শুধু শুধু এভাবে বিড়ম্বনায় কখনো ফেলবেন না। এই বলেই অনন্ত হাঁটতে শুরু করে।

এমন সময় দূর থেকে একটি ছেলের কণ্ঠ, “কিরে মাধবী, রিকশা নিয়ে আয়!” অনন্তকে দেখতেই ছেলেটি এগিয়ে গিয়ে বলে, আরে তুই এখানে! মেলায় এসেছিলি?

অনন্তও এগিয়ে আসে, হ্যাঁ। কখন এসেছিস তুই। আমরা সবাই তো ছিলাম। তোকে তো দেখলাম না?
আর বলিস না, ঢাকা থেকে কাকাতো বোন এসেছে ঘুরতে। তাই ওকে নিয়ে মেলায় এসেছিলাম। এই মাধবী, এদিকে আয়, অনন্ত’র সাথে পরিচয় করিয়ে দিই।

সবকিছু দেখে মাধবী তো রীতিমতো লজ্জিত। ‘ছি ছি! এটা আমি কী করলাম।’ ইনি রনি’দার পরিচিত! না বুঝে কতকিছু বলে ফেলেছি। মাধবী রিকশা থেকে নেমে আসে। চোখেমুখে লজ্জা আর অনুতাপের রেখা স্পষ্ট। রিকশাওয়ালার মুখে মিটিমিটি হাসি।

রনি বলে, ও হলো আমার শৈশবের বন্ধু অনন্ত। আমার সবচে কাছের বন্ধু। একই গ্রামে থাকি আমরা।
দু’চোখ মেলে অনন্ত’র দিকে তাকায় মাধবী, নম্রভাবে বলে, “কেমন আছেন।”

অনন্তও রীতিমতো লজ্জিত। এমন এক অপ্রীতিকর অবস্থায় পড়তে হবে কল্পনাই করতে পারেনি ও। মাধবীর দিকে তাকাতেই ও আবিস্কার করে এক অন্যরকম সৌন্দর্যের ঝর্ণাধারা। মেয়েটি এতটা সুন্দর, সেটা ওর নজরেই আসেনি। হয়তো তর্কে তর্কে সেটা ধরাই পরেনি!

অনন্ত বলে – ভালো আছি। তুমি কেমন আছ।
– জি ভালো।
রনি বলে – তো বাড়ি যাবি না?
– হ্যাঁ, কিন্তু রিকশা পাচ্ছি না। একটা পেয়েছিলাম কিন্তু একজন এসে ছোঁ মেরে উড়িয়ে নিয়ে গেলো
– নিয়ে গেলো, আর ছেড়ে দিলি? দু’চারটা দিতে পারলি না আচ্ছা মতো?
– মানুষটাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে, তাই ছেড়ে দিয়েছি।
– মানে!
– আরে কিছু না। বাদ দে। তোরা যা আমি পরে আসছি।

মাধবী আর রনি রিকশায় উঠে বসে। রিকশায় ওঠার সময় মিটিমিটি হাসি নিয়ে মাধবী আড় চোখে একবার তাকায় অনন্ত’র দিকে। ঠিক ওই সময় তাকায় অনন্তও। মাধবীর ওই মায়াবী চোখে চোখ পড়তেই অনন্ত’র বুকের ভেতর দিয়ে বিদ্যুতের মতো কী যেন বয়ে যায়। ঠিক বিদ্যুৎ নয় কিন্তু বিদ্যুতের মতো তীব্র গতিময়।

সকালের দিকে পুকুরে বঁড়শি দিয়ে মাছ ধরছে অনন্ত। ওদেরই পুকুর। মাছেদের তেমন সাড়া নেই, তাই বঁড়শি ফেলে অলসভাবে বসে আছে। মনের মধ্যে মাধবীর মুখটা ভেসে উঠছে বারবার। রনির বাসায় গেলেই হয়তো ওকে দেখা যেত কিন্তু সেটা খারাপ দেখাবে। ওর বাসা থেকে দূরে নয় রনির বাসা। হেঁটে গেলে মিনিট কয়েকের পথ। কিন্তু সেটা ভালো দেখাবে না। এদিকে মাধবীর ওই মায়াবী চোখ, সুবাসিত হাসি কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না অনন্তকে। এমন সময় পেছন থেকে রনির কণ্ঠ, “কিরে সকাল সকাল মাছ ধরতে বসে গেছিস।”

– কী করবো বল। সময় তো কাটাতে হবে। বিকেল থেকেই শুরু হবে টিউশনি। কী হলো, দাঁড়িয়ে আছিস কেন, বসে পড়।
রনি এসে ওর পাশে বসে।
– “কী হলো? আমাকে বসতে বলবেন না?” পেছন থেকে মাধবীর কণ্ঠ ভেসে আসে।

বুকের ভেতর ছ্যাঁত করে ওঠে অনন্ত’র। অবাক হয়ে পেছনে তাকাতেই দেখে, মিটিমিটি হাসছে মাধবী। অনন্ত বলে, “বুঝতেই পারিনি তুমি এসেছ! বসো বসো।”
আকাশি রঙের থ্রি-পিসে মাধবীকে আজ অন্যরকম সুন্দর লাগছে।

মাধবী বলে –
– আমিও মাছ ধরবো।
– পারবি তুই? জীবনে তো পুকুরেই নামিসনি! হাসতে হাসতে রনি বলে।
মাধবীর মুখটা গোমড়া হয়ে যায়, “নামিনি তো কী হয়েছে, চেষ্টা তো করি!”

এর মধ্যে বাড়ি থেকে ফোন আসে রনির, ওর মা ফোন করেছে। কী যেন দরকারে যেতে হবে এখনি।
রনি বলে, “চল মাধবী। মা ডাকছে।”
– তুমি যাও, আমি একটু পর আসছি। দেখি মাছ ধরতে পারি কিনা।
– রনি তুই ঘুরে আয়। দেখ কাকিমা কী বলে। তোর দেরি হলে আমিই ওকে পৌঁছে দেবো। অনন্ত বলে।
– আচ্ছা ঠিক আছে। এই বলেই রনি চলে যায়।

পুকুরের ঘোলা জলের দিকে তাকিয়ে দু’জনই চুপ করে আছে। কারো মুখেই কথা নেই। হঠাৎ মাধবীই বলে, “আসলে দাদা, গতকালের জন্য সত্যিই আমি দুঃখিত!”
– আরে না না। আমারও তো ঠিক হয়নি ওরকম আচরণ করা। ওসব কথা থাক। আমরা বরং অন্য কথা বলি।
মিষ্টি হাসি ছড়িয়ে পড়ে মাধবীর মুখে – হু, সেটাই ভালো।
মাধবীর এই হাসি অনন্ত’কে অন্যরকম এক সুখ দিয়ে যায়, যেন মাধবীর মুখ থেকে হাসি নয়, ঝরে পড়ছে রাশি রাশি শিউলি বকুল চামেলি।

এভাবে কথায় কথায় বেশ কিছুক্ষণ পেরিয়ে যায়। হঠাৎ অনন্ত’র বঁড়শিতে কী যেন একটা বাঁধে। তড়ি-ঘড়ি করে টান দিতেই মাছের পরিবর্তে উঠে আসে গাছের একটা ডাল। হতাশ হয়ে বোকার মতো চেয়ে থাকে অনন্ত। অনন্ত’র এই অবস্থা দেখে ফিক করে হেসে ওঠে মাধবী, সেই হাসি আর থামতেই চায় না। নিজের অজান্তেই মাধবীর হাসির দিকে দৃষ্টি চলে যায় অনন্ত’র।
মাধবী বলে – কী হলো! কী দেখছেন ওভাবে?
– ফুলের পাপড়ি ঝরে পড়া দেখছি।
– মানে!
– কিছু না
– কিছু না মানে! বলুন কী দেখছেন ওভাবে?
– আসলে, তুমি যখন হাসো। তখন তোমার হাসি থেকে ফুল ঝরে পড়ে, পাপড়ি ঝরে পড়ে। আমার মনে হয়, তোমার হাসি পৃথিবীর সবচে সুন্দর হাসি। যে হাসি সুগন্ধ ছড়ায়, মনের মধ্যে সুখের নির্যাস ছড়ায়।

লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে মাধবীর মুখ। লাজুক দৃষ্টিতে অনন্ত’র দিকে তাকিয়ে বলে, “আপনি অনেক সুন্দর করে কথা বলেন অনন্ত দা। এমন সুন্দর করে কেউ কখনো বলেনি আগে।”
– সুন্দর করে বলতে পারি কিনা জানি না, তবে এতটুকু জানি অসম্ভব সৌন্দর্য নিয়ে জন্মেছ তুমি। চিরকাল চেয়ে থাকার সাধ জাগে।
কথাটা শুনে মাধবীর মুখটা কেমন জানি মলিন হয়ে ওঠে, পুকুরের জলের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবনায় হারিয়ে যায় ও।
অনন্ত বলে, “মুখটা কেমন জানি মনিল হয়ে গেল তোমার। আমার কথায় কোনো ভুল হয়নি তো!”
– না না। এমনটা ভাববেন না।
– আচ্ছা চলো, তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিই, অনেক সময় হয়ে এলো।
– হ্যাঁ চলুন, নইলে সবাই চিন্তা করবে।
– আচ্ছা মাধবী, কতদিন থাকবে এখানে?
– দু’তিন-দিন হয়তো থাকবো আর।

কথাটা শুনে মুহূর্তেই মুখটা শুকিয়ে যায় অনন্ত’র। বলে – “আমাদের গ্রামে সারাজীবন থেকে যেতে ইচ্ছে করে না তোমার?”
কথাটা শোনার সাথে সাথেই হাঁটা থামিয়ে দেয় মাধবী, মুখটা আবারও ঢেকে যায় নিকষ কালো মেঘে, অনন্ত’র দিকে তাকিয়ে উত্তর দেয়, “জানি না দাদা”।
– কী হয়েছে তোমার? মুখটা বারবার এমন মলিন হয়ে যাচ্ছে!
– কিছু না দাদা, এমনিতেই।

এরপর কেটে যায় আরও একটা দিন। এর মধ্যে মাধবীর সাথে অনন্ত’র আর কোনো দেখা নেই। এদিকে মাধবীকে এক পলক দেখার জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে আছে অনন্তর। বারবার যেতে চেয়েও শেষপর্যন্ত আর যাওয়ার সাহস হয়নি। রনি কী ভাববে না ভাববে এই ভেবে। বিকেলের দিকে টিউশনিতে যাচ্ছে অনন্ত। এমন সময় অচেনা নাম্বার থেকে ফোন আসে ওর, ধরতেই ভীষণ অবাক হয় ও। ওপাশ থেকে মাধবীর গলা, “কেমন মানুষ আপনি! দুটো দিন পেরিয়ে যাচ্ছে অথচ কোনো খবরই নেই আপনার?”
অনন্ত বলে – না মানে, একটু ব্যস্ত ছিলাম। তাই আসতে পারিনি। কেমন আছ তুমি।
– ভালো নেই। মনটা ভীষণ খারাপ।
– কেন, কী হয়েছে?
– ভেবেছিলাম নৌকায় করে নদীতে একটু ঘুরে বেড়াবো। কিন্তু রনি’দা হঠাৎ শহরে চলে গেল কাজে। কেমন লাগে বলুন! এ গ্রামে আমার তো আর তেমন কেউ নেই, যে আমাকে গ্রাম ঘুরে দেখাবে, নৌকা ভ্রমণ করাবে।
কী বলবে না বলবে বুঝতে পারে না অনন্ত। রনিও নেই, মাধবীকে চাইলেই ও ঘুরতে নিয়ে যেতে পারে তাতে রনির বাড়ির কারো কোনো আপত্তি থাকবে না। কিন্তু রনি হয়তো ব্যাপারটা অন্যভাবে নিতে পারে। ওকে তো ফোন করে বলাও যাচ্ছে না।
মাধবী আবারও বলে, “কী হলো, চুপ মেরে গেলেন যে! আসলে আমার কপালটাই খারাপ। রনি’দাও চলে গেল আর আপনি তো মহাব্যস্ত মানুষ। দেখা পাওয়াই দুষ্কর”।
ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে অনন্ত বলে, “মন খারাপ কোরো না, বাড়িতে জানিয়ে চলে এসো। তোমাকে আমিই নিয়ে যাবো। আমার সাথে যেতে আবার আপত্তি টাপত্তি নেই তো!”
– না না, কিসের আপত্তি
– সেদিনের রিকশার ঘটনাটা ভুলে গেলে!
হেসে ওঠে মাধবী, নৌকা নিয়েও কি তেমন কিছু করবেন?
অনন্তও হাসতে হাসতে বলে, করতেও তো পারি!

ছোট একটি ডিঙি নৌকায় উঠেছে ওরা। মাধবীর বহুদিনের ইচ্ছে ছিল, এমন একটি নৌকার ঘুরে বেড়ানো। সেই ইচ্ছে আজ পূরণ হওয়ায় ভীষণ আনন্দিত ও। বৈঠা হাতে নৌকা বাইতে বাইতে অনন্ত হা করে তাকিয়ে আছে মাধবীর দিকে। মাঝে মধ্যে দুলে উঠছে নৌকা, তখন বেশ ভয় পাচ্ছে মাধবী, “অনন্ত’দা পড়ে যাবো তো। ভালোভাবে চালান না!”
অনন্ত হাসে আর বলে, “এতো ভয় কিসের, তুমি পড়ে গেলে আমি তুলে আনবো”।
– তুলতে তুলতেই যদি ডুবে মরে যাই!
– তাহলে আমিও তোমার সাথে ডুবে যাবো।
– কেন, আমি মরে গেলে আপনাকেও মরতে হবে কেন?
কোনো কথা বলে না অনন্ত, নীরব দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে শুধু।

এভাবে যেতে যেতে ওরা এসে পৌঁছে একটি বিলের ভেতর। এ বিলে বছরের বেশিরভাগ সময়ই জল থাকে। বিলের ভেতর রং বেরঙের শাপলা ফুটে আছে। মাধবীর সেকি আনন্দ! এত শাপলা এক সাথে কখনো দেখেনি ও। অনন্ত’র কাছে এগিয়ে এসে বলে, “দাদা, আমাকে কিছু শাপলা তুলে দেন না প্লিজ!”
অনন্ত মনে মনে বলে, শুধু শাপলা কেন মাধবী, তুমি চাইলে নিজের জীবনটাও দিয়ে দিতে পারি।
– কী হলো দাদা। দেবেন না তুলে?
ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে অনন্ত বলে, অবশ্যই!
এরপর একে একে অনেকগুলো শাপলা তুলে আনে অনন্ত। ফুলগুলো হাতে পেয়ে কীযে আনন্দ মাধবীর, যেন ফুল নয়, ও খুঁজে পেয়েছে জীবনের সবচে বড় সুখ।
– আজ আমি সত্যিই অনেক খুশি দাদা, এই সুন্দর গ্রামে, নদী নৌকা আর ফুলের টানে আমি বারবার ফিরে আসবো।
মাধবী অনন্ত’র পাশে গিয়ে বসে, “তারপর বলে, কিছু বলছেন না যে! শুধু আমিই বকবক করবো”!
– সত্যি বলছি মাধবী, যখন আমি তোমার দিকে তাকাই, আমার মুখে কোনো ভাষা থাকে না। এক অন্যরকম সৌন্দর্যে ডুবে থাকি।
মাধবীও বলে, আর আমি ডুবে থাকি আপনার কথার সৌন্দর্যে। এমন সুন্দর করে আপনি কথা বলেন, যেন এগুলো কথা নয়, শুনছি সুমধুর কোনো গান। যে গান শুনে শুনে কাটিয়ে দেয়া যায় এমন হাজারো বিকেল।

শেষ বিকেলের আলোয় মাধবীর সুন্দর মুখখানা আরও সুন্দর আরও মায়াবী হয়ে উঠেছে। দূরে হেলে পড়া সূর্যের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছে ও। মাঝেমধ্যে স্নিগ্ধ বাতাস এসে উড়িয়ে দিচ্ছে ওর চুল।
অনন্ত বলে, কী হলো মাধবী, কথা বলছো না যে।
মাধবী চোখ মেলে তাকায়, কী বলবো অনন্ত দা! আমার কি কিছু বলার ছিল?
– জানি না মাধবী। হয়তো আছে অনেক কিছু বলার, হয়তো নেই! আমি তো শুধু ব্যাকুলতাটুকুই জানাতে পারি!
– কিসের ব্যাকুলতা দাদা
– তুমি জানো মাধবী, তবু কেন এই প্রশ্নবাণ!

পাশেই সুন্দর একটি লাল শাপলা ফুটে আছে, ফুলটা বেশ বড়। ওটা এনে দিতে বলে মাধবী, অনন্ত ফুলটা তুলে এনে বলে, “এই নাও”।
– এভাবে নয়, ফুলটা আপনি আমার খোঁপায় গুজে দিন
কথাটা শুনে অনন্ত কেমন জানি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, ও বিশ্বাস করতে পারছে না মাধবী ওকে ফুলটা গুজে দিতে বলেছে।
– কী হলো, দেবেন না! ভয় না লজ্জা? কোনটা পাচ্ছেন?
– না না, কোনোটাই নয়। ঠিক আছে দিচ্ছি।
এরপর ফুলটা মাধবীর খোঁপায় গুজে দেয় ও। হঠাৎ নৌকাটা কিসের সাথে যেন ধাক্কা খেয়ে দুলে ওঠে, ভয়ে চিৎকার করে ওঠে মাধবী। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অনন্ত’র বুকের ওপর ঢলে পড়ে।অনন্ত যদিও কোনোরকমে নিয়ন্ত্রণ রেখে দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু ফুলের পাপড়ির মতো কোমল মাধবীর শরীরের স্পর্শ অনন্ত’র বুকের ভেতর সৃষ্টি করে অন্যরকম এক ঝড়। ধুকধুক করে কাঁপতে থাকে ওর বুক।

অনন্ত’র বুক থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায় মাধবী। লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে ও। তাতে আরও সুন্দর আরও মোহনীয় হয়ে উঠেছে ওর মুখখানি। সাঁঝের প্রদীপের মতো চোখদুটো মেলে তাকায় মাধবী। তাকায় অনন্তও। দু’জন দু’জনের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। মুখের আঙিনায় কোনো কথা নেই, বাক্য নেই, শব্দ নেই ওদের।

কিছুক্ষণ পর অনন্ত বলে – যখন তুমি আমার দিকে তাকাও, পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। আমার মনে হয়, রয়েছি নতুন এক পৃথিবীতে। যেখানে কোনো দুঃখ নেই, কষ্ট নেই। তোমার এই চাঁদের মতো মুখ, মায়াভরা মুখ, ঘিরে রাখে আমার চারপাশ। আমার নিশ্বাস হয়ে, আনন্দ হয়ে, আমার যাবতীয় সুখ হয়ে।
মাধবী বলে – এমন করে বলবেন না দাদা, ভীষণ ভয় হয় আমার। শ্রাবণের বৃষ্টির মতো, হেমন্তের আকাশে চাঁদের আলোর মতো যে মুগ্ধতা, যে ভালোলাগা ছড়িয়েছেন আপনি। তা আমার নিশ্বাস হয়ে উঠেছে, বিশ্বাস হয়ে উঠেছে। আমারও মনে হয়, নতুন এক পৃথিবী পেয়েছি আমি। যা কেবল আপনিই দিয়েছেন।

দেখতে দেখতে কখন যে ওরা চলে এসেছে বিকেলের শেষপ্রান্তে, টেরই পায়নি। এর মধ্যেই বাড়ি থেকে ফোন আসে মাধবীর। চলে যেতে হবে। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। এক পৃথিবী আক্ষেপ নিয়ে ওরা বাড়ির দিকে ফিরে যায়। যদি আরও দীর্ঘ হতো এই বিকেল! কিংবা চলতো অনন্তকাল ধরে!

অনন্ত’র মা হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে, কোনো উপায় না পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। ঔষধ কেনা, ডাক্তারের সাথে দেখা করা, এইসব করতে করতে চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে দিয়ে দুটো দিন যে কিভাবে কেটে যায় বুঝতেই পারে না অনন্ত। মাধবীর কথা মনে পড়েনি, তেমনটা নয়। মনে পড়েছে ভীষণ। দু’বার ফোনও করেছিল মাধবী, কিন্তু ধরার মতো উপায় ছিল না অনন্ত’র। এর কয়েক ঘণ্টা পর ফোন করে ওকে আর পাওয়া যায়নি। ফোনটা বন্ধ। অনন্ত’র তখন উপায় তো ছিল না। ওই মুহূর্তে মায়ের চিন্তা ছাড়া আর কোনো চিন্তাই কাজ করছিল না। রনিও বেপাত্তা। কয়েকদিন হলো ওরও দেখা নেই। হয়তো ব্যবসার কাজে ব্যস্ত। রনির কাছে ফোন দিয়ে তো আর মাধবীর খবর নেয়া যায় না! এভাবে তিনদিনের মাথায় অনন্ত’র মা কিছুটা সুস্থ বোধ করেন, তাই তাকে বাড়ি নিয়ে আসা হয়।

এদিকে অনন্ত’র বুকের ভেতর ছটফটানি উঠে গেছে সর্বোচ্চ সীমায়। মাকে বাড়িতে রেখেই মাধবীকে ফোন করে কিন্তু সেই আগের মতোই বন্ধ। মনটা অস্থির হয়ে ওঠে আরও। সাতপাঁচ না ভেবেই ও ফোন করে রনিকে। রনিই বলতে পারে, কেন মাধবীর ফোন বন্ধ। তাতে রনি যা ভাবে ভাবুক, কিছু যায় আসে না। রনি ফোনটা ধরতেই অনন্ত বলে, “কোথায় তুই?”
– অনন্ত, আমি জানি কী কারণে ফোন করেছিস। মাধবীর খোঁজ করছিস তো? যাই হোক, আমি বাড়িতেই আছি। একটু পুকুরের পাড়ে আয়। কথা আছে।
অস্থির হয়ে অনন্ত বলে, “যেহেতু বুঝতেই পেরেছিস, তাহলে খুলে বল না বন্ধু, কী হয়েছে। ফোনে ওকে পাচ্ছি না কেন? কোথায় আছে ও”?
– পুকুরের পাড়ে আয়, সব বলছি।
এক মুহূর্ত দেরি না করে দ্রুত চলে যায় পুকুর পাড়ে।

রনি বলে – “দেখ অনন্ত, মানুষের জীবন বড্ড বিচিত্র বড্ড অসহায়। নিয়তির কাছে আমরা সকলেই বাঁধা। কখন কিভাবে কী হয়ে যায়, আমরা তার কিছুই টের পাই না। এতো সুন্দর ফুটফুটে মেয়ে মাধবী, কতই আর বয়স হয়েছে বল! অথচ দেখ, ক্যান্সার নামক মরণব্যাধিটা ওর কপালেই লেখা ছিল। গত সপ্তাহেই ওর ক্যান্সার ধরা পরেছে। দুঃসংবাদটা খুব কষ্টে ওর কাছ থেকে গোপন রেখেছি আমরা। কিন্তু মনে মনে কেমন জানি এক সন্দেহের মধ্যে থাকে ও। বারবার জিজ্ঞেস করে, বড় কোনো অসুখ হয়নি তো? কাকা কাকি বারবার মিথ্যে বলে বুঝানোর চেষ্টা করছে। মিথ্যে বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে গেছেন ওনারা। ওনারা মাধবীর মুখের দিকে তাকাতে পারে না। কান্না চলে আসে। ক্যান্সারটা শেষ ধাপে চলে গেছে, বাঁচার কোনো আশা নেই আর। কাকা কাকির কান্না দেখলেই ও হয়তো বুঝে ফেলতে পারে। তাই ওকে এখানে কয়েকদিনের জন্য ঘুরতে পাঠিয়েছিল, যেন ওর মনটাও ভালো থাকে। এখন মাদ্রাজ নিয়ে শেষ চেষ্টাটা করে দেখবেন। যদি ঠিক হয়! এক পার্সেন্ট চান্স থাকলেও চেষ্টা করবেন তারা।

জানিস অনন্ত, কিছুতেই যেতে চাচ্ছিলো না ও, কিন্তু কাকা অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে নিয়ে গেছে। যাওয়ার সময় তোকে নাকি ফোন করেছিল কয়েকবার! ধরিসনি তুই। খুব কষ্ট পেয়েছে রে! তোর কথা বলে ওর চোখ প্রায় অশ্রুতে ভিজে এসেছিল। হয়তো অনেক কথা বলার ছিল তোকে! যাওয়ার আগে তোকে এই চিঠিটা দিয়ে গেছে।

কথাগুলো শুনে অনন্ত’র বুকের ভেতর কষ্টের আগুন দাউদাউ করে আগুন জ্বলতে থাকে। আহত হৃদয় নিয়ে চিঠিটা খোলে।

অনন্ত’দা,
হয়তো আর কোনোদিন আমাদের দেখা হবে না। তাই শেষবারের জন্য আপনার কণ্ঠ শুনতে ব্যাকুল হয়ে ফোন করেছিলাম। জানি না কেন ধরেননি। জানতেও চাই না। হয়তো আমার ভাগ্যে নেই! আমি দেখেছি, লুকিয়ে লুকিয়ে মা বাবা আমার জন্য কান্না করে, খুব ভয় হয় অনন্ত’দা। আমি হয়তো বেশীদিন আর বাঁচবো না! নইলে আমার জন্য তারা কেন এতো কান্না করবে! শুনেছি আমাকে নাকি মাদ্রাজ নিয়ে যাবে। সেখান থেকে যদি আর না-ই ফিরি, চলে যাই পরপারে মৃত্যুর আমন্ত্রণে। তাহলে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করবেন, মাধবী নামে কেউ ছিল। যেভাবে মানুষ একদিন ভুলে যায়, বহুদিন আগে দেখা কোনো দৃশ্য কিংবা মানুষের মুখ!

বিশ্বাস করুন অনন্ত’দা, যদি কোনোভাবে ফিরেই আসি, তবে আপনার কাছে আসবোই। না বলা কথাগুলো বলতে, সুখের নির্যাস নিতে আমি আসবোই। যদিও সেই সম্ভাবনা কতটা ক্ষীণ সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি। মনে আছে অনন্ত’দা? আপনি বলেছিলেন, আপনার গ্রামে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার ইচ্ছে করে কিনা? সেই ইচ্ছে নিয়েই ফিরে আসব। ফিরতে চাই অনন্ত দা, আমি ফিরতে চাই। খুব করে ফিরতে চাই। মা বাবার জন্য ফিরতে চাই, নতুন পৃথিবীর জন্য ফিরতে চাই আর ফিরতে চাই আপনার জন্য। খুব খুব ভালো থাকবেন অনন্ত’দা, এই প্রত্যাশায়…

মাধবী

কোনো ভাষা নেই অনন্ত’র মুখে, অশ্রুতে টলমল করছে চোখ। রনি সান্ত্বনা দিয়ে বলে – “দেখ অনন্ত এত ভেঙে পরিস না। বিধাতাকে ডাক, যেন সুস্থ হয়ে ফিরে আসতে পারে ও”।

চোখ মুছতে মুছতে উঠে পড়ে অনন্ত। “হ্যাঁ, সেটা ছাড়া কিছু তো করার নেই আর। আমি যাই রে, ও কেমন আছে না আছে খবর নিয়ে জানাস”। এরপর হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির দিকে চলে যায় অনন্ত।

এভাবে কেটে যায় কয়েক সপ্তাহ, এর মধ্যে মাধবীর অবস্থা নাকি আরও খারাপের দিকে। বিধ্বস্ত হৃদয় নিয়ে সেই নদীর ধারে একা একা বসে আছে অনন্ত। মনের আকাশে মেঘের মত ভেসে উঠছে সেইসব স্মৃতি। নদীর বুক চিরে দূর থেকে এগিয়ে আসছে একটি ডিঙি নৌকা, এমনই এক নৌকায় মাধবীকে নিয়ে ঘুরেছে ও, কত রঙিন ছিল সেই বিকেল, সেই মুহূর্ত। আজ সেই নৌকা আছে, নদী আছে, শুধু মাধবীই কাছে নেই। বুকের ভেতর থেকে হুহু করে কান্না বেরিয়ে আসতে চায়। এর মধ্যেই রনির ফোন আসে। অনন্ত ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে রনি বলে – “মাধবী আর নেই”!

কথাটা শোনামাত্র অথৈ শূন্যতা এসে আছরে পড়ে অনন্ত’র বুকের ভেতর। ফোনটা কেটে দেয়। কান্না চেপে রাখতে পারে না কিছুতেই। দূর আকাশে ভেসে ওঠে মাধবীর হাসিমাখা মুখ। আহত হৃদয় নিয়ে চেয়ে থাকে, চোখ বেয়ে অশ্রুধারা নামে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে