বঙ্গবন্ধুর জীবনের ১০টি অজানা ঘটনা

ট্যাগসমূহ:
0
616
ছবি: মো. সাইদুল ইসলাম

১) অনেকেই হয়তো জানেন না, ১৯৬২ সালে বঙ্গবন্ধু একটা আন্ডারগ্রাউন্ড বিপ্লবী দল গঠন করেছিলেন, যার নাম ছিলো – “স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ।”
এই দলের গোপন শাখা তিনি বাংলার প্রতিটি থানায় গঠন করেন। এই কারণে এর আরেক নাম ছিলো ’নিউক্লিয়াস।’

২) সামান্য একটা মিছিলে নেতৃত্ব দেবার কারণেও উনাকে আড়াই বছর জেল খাটতে হয়েছে। এত লঘু দোষে এত গুরুদন্ড এই উপমহাদেশের আর কোন নেতা পেয়েছে?
বঙ্গবন্ধু এমন একজন নেতা ছিলেন, শুধুমাত্র তার জেলখানার জীবন নিয়েই হাজার পাতার আত্নজীবনী লেখা সম্ভব।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা চারটি খাতা ২০০৪ সালে আকস্মিকভাবে তারই কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে আসে। অনেক আগের খাতাগুলোর পাতা ছিল জরাজীর্ণ, লেখাও অস্পস্ট। মূল্যবান সেই খাতাগুলো পাঠ করে জানা যায় এটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী।
১৯৬৮ সালের মাঝামাঝি যা তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বসে লিখেছিলেন, কিন্তু শেষ করতে পারেননি।
তার সেই খণ্ড খণ্ড লেখা নিয়ে ২০১২ সালে প্রকাশিত হয়েছে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি।
আত্মজীবনী অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধুর ভাষায়- ‘একদিন সকালে আমি ও রেণু বিছানায় বসে গল্প করছিলাম। হাচু ও কামাল নিচে খেলছিল। হাচু মাঝে মাঝে খেলা ফেলে আমার কাছে আসে আর ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ বলে ডাকে। কামাল চেয়ে থাকে। এক সময় কামাল হাচিনাকে বলছে, “হাচু আপা, হাচু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি। ” আমি আর রেণু দু’জনই শুনলাম। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে যেয়ে ওকে কোলে নিয়ে বললাম, “আমি তো তোমারও আব্বা। ” কামাল আমার কাছে আসতে চাইত না। আজ গলা ধরে পড়ে রইল। বুঝতে পারলাম, এখন আর ও সহ্য করতে পারছে না। নিজের ছেলেও অনেক দিন না দেখলে ভুলে যায়! আমি যখন জেলে যাই তখন ওর বয়স মাত্র কয়েক মাস। রাজনৈতিক কারণে একজনকে বিনা বিচারে বন্দি করে রাখা আর তার আত্মীয়-স্বজন ছেলে-মেয়েদের কাছ থেকে দূরে রাখা যে কত বড় জঘন্য কাজ তা কে বুঝবে? মানুষ স্বার্থের জন্য অন্ধ হয়ে যায়। ’
বইটির প্রচ্ছদের পরেই বর্ণনা করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী পাওয়ার ঘটনা। বঙ্গবন্ধু কন্যা ২০০৭ সালে শেরে বাংলানগরে সাব জেলে বসে আত্মজীবনীর ভূমিকা লেখেন।
সেদিনের সেই হাচু আপা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লিখেন, ‘আমার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জীবনের সব থেকে মূল্যবান সময়গুলো কারাবন্দি হিসেবেই কাটাতে হয়েছে।…”
খুব সম্ভবত ভারতীয় উপমহাদেশে তিনি ব্যতীত আর কাউকে এক জীবনে এতবার কারাবরণ করতে হয়নি।
এমনও হয়েছে, তিনি ৩ মাসের ভেতর ৯ বার গ্রেফতার হয়েছেন।
বাংলাদেশের এমন কোন বড় জেলা শহর ছিলো না, যেখান থেকে তিনি জীবনে একবারো গ্রেফতার হন নি।
এমনও হয়েছে, তিনি প্রায় ১৫ মাস জেল খেটে সবেমাত্র জেল গেট থেকে বের হয়েছেন মুক্তি নিয়ে। অমনি তাকে ঐ জেল গেট থেকেই আবার গ্রেফতার করা হয়েছে।
একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে তাকে হয়রানি করা হয়েছে। আগরতলা মামলা ছাড়াও পাকিস্থান সরকার তাঁর নামে এক সাথে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ২৮ টি মামলা করে, এবং প্রতিটি মামলাই ছিলো মিথ্যা মামলা।
মোদ্দা কথা, তার জীবনের একটা বিশাল অংশ কেটেছে জেল খানায়।

৩) ১৯৭০ সালের অক্টবর মাসে তিনি তাঁর দলের নির্বাচনী প্রতিক হিসেবে নৌকাকে মনোনীত করেন, এবং পুরান ঢাকার ধোলাইখালে প্রথম নির্বাচনী জনসভার মধ্য দিয়ে গনসংযোগ শুরু করেন।
এর কিছুদিন পর, তিনি জীবনে প্রথম বারের মতো টেলিভিশন চ্যানেলে সারা দেশবাসীর কাছে আহ্বান জানান আওয়ামীলিগকে জয়যুক্ত করার জন্য।

৪) তাঁর বিরুদ্ধে আগরতলা মামলার কথা সবাই জানেন।
কিন্তু এই মামলা প্রত্যাহারের ইতিহাস কয়জন জানেন? কোন প্রেক্ষিতে এই মামলা প্রত্যাহার করতে আইয়ুব সরকার বাধ্য হয়েছিলো?
তাঁকে বঙ্গবন্ধু নামে ডাকার শুরুটাই বা কবে থেকে?
১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবীতে সমগ্র দেশে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়।
ক্রমেই আন্দোলনের মাত্রা এতটাই বেড়ে যায় যে, সেটা রীতিমতো গন অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। এই কারনেই একে বলা হয়ে থাকে ’উনসত্তুরের গন অভ্যুত্থান।’
শেষে আইয়ুব সরকার “তোমাদের নেতাকে প্যারোলে মুক্তি দেয়া হবে” বলে ঘোষনা দিতে বাধ্য হয়।
কিন্তু প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন শেখ মুজিব প্যারোলে মুক্তি গ্রহণকে সরাসরি প্রত্যাখান করেন।
এদিকে জনগনের অব্যহত চাপের মুখে কেন্দ্রীয় সরকার বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি তো দেয়ই, এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে সেই কুখ্যাত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাও প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়।
এরপর কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে তাঁকে ঢাকার বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক অভূতপূর্ব সম্বোর্ধনা দেবার ব্যবস্থা করা হয়।
সেখানে প্রায় ১০ লাখ ছাত্র জনতার উপস্থিতিতে তাকেঁ আনুষ্ঠানিকভাবে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

৫) পচিঁশে মার্চ তাঁকে তাঁর বাসা থেকে রাত দেড়টা বাজে পাকিস্থান সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ টিম গ্রেফতার করে প্রথম ঢাকা ক্যানটনমেন্টে ও পরবর্তীতে পাকিস্থান নিয়ে গিয়ে সেখানকার জেলে প্রেরণ করা হয়।
এর পর দিন জেনারেল ইয়াহিয়া এক ভাষণে আওয়ামী লিগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, এবং বঙ্গবন্ধুকে দেশদ্রোহী বলে আখ্যায়িত করে।
তাকেঁ ভীত করতে পাকিরা এমন কোন কাজ নেই যেটা করে নাই।
এমনকি তার সেলের মেঝেতে একটা কবরও খুড়েঁ রাখা হয়েছিল তাকে মানসিকভাবে দুর্বল করার জন্য।
কিন্তু হিমালয়ের মতো মনোবলের অধিকারী এই মানুষটার মনোবল তাতে এতটুকুও টলেনি।
অথচ আপনি কি জানেন তাঁকে দেশ স্বাধীন হবার পর পাকিস্থানের কারাগার থেকে মুক্ত করে পাকি সরকার জানের ভয়ে সরাসরি বাংলাদেশে পাঠায়নি?
তাঁকে প্রথমে প্লেনে করে লন্ডন পাঠানো হয়, তারপর লন্ডন থেকে ঢাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। সেটা দেশ স্বাধীন হবার পরের মাসের ঘটনা। ৮ জানুয়ারি ১৯৭২ সালের ঘটনা।
এই পুরো ঘটনাটিতে একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর প্রগাঢ় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠেছে। (এই ঘটনাটি বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন Hasan Murshed ভাই। তারঁ পোষ্টের লিংক কমেন্টের ঘরে দিলাম।)

৬) আমাদের দেশের নামটাও যে স্বয়ং বঙ্গবন্ধু রেখেছিলেন, এই তথ্য আমরা কয়জন জানি?
তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যে শুধু আমাদের একটি স্বাধীন দেশ উপহার দেন নি।
তিনি এই দেশের নামটাও ঠিক করে রেখে গিয়েছিলেন। (এবং এই মানুষটিই জাতিসংঘের মতো বিশ্বের দরবারে প্রথম বাংলা ভাষায় ভাষন দেন।)
১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলার নামকরণ করেন ‘বাংলাদেশ’।
কেন এই নামকরণ, সেটাও তিনি গুছিয়ে ব্যাখা করেছিলেন সেদিনঃ
‘একসময় এদেশের বুক হইতে, মানচিত্রের পৃষ্ঠা হইতে ‘বাংলা’ কথাটির সর্বশেষ চিহ্নটুকুও চিরতরে মুছিয়া ফেলার চেষ্টা করা হইয়াছে।
একমাত্র ‘বঙ্গোপসাগর’ ছাড়া আর কোনো কিছুর নামের সঙ্গে ‘বাংলা’ কথাটির অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায় না।
তাই জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি-আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম হবে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ এর পরিবর্তে শুধুমাত্র ‘বাংলাদেশ’।
(সূত্রঃ অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা ২৯৭।)

৭) এই ঘটনার আগে, ১৯৫৫ সালে আওয়ামী লিগ থেকে জয়লাভ করার পর করাচীতে পাকিস্থানের গন পরিষদে উপস্থিত হন তিনি।
এক পর্যায়ে সংসদে মাইক দিয়ে দাঁড়িয়ে শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর গমগমে কণ্ঠস্বরে স্পিকারকে বললেন, ‘স্যার, আপনি দেখবেন, ওরা পূর্ব বাংলা নামের পরিবর্তে পূর্ব পাকিস্তান নাম রাখতে চায়। আমরা বহুবার বলেছি, আপনারা এ দেশটাকে ‘বাংলা’ নামে ডাকেন। বাংলা শব্দটার একটা নিজস্ব ইতিহাস আছে, আছে এর একটা ঐতিহ্য। কিন্তু তারা শুনে নাই।
আপনারা এই নাম পরিবর্তন করতে চাইলে আমাদের জনগণের সঙ্গে আলাপ করতে হবে। আমাদের বাংলায় আপনাদের আবার যেতে হবে, এবং সেখানকার জনগনের কাছে জানতে চাইতে হবে যে, তারা নাম পরিবর্তনকে মেনে নেবে কিনা।’

৮) মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হলে তারঁ একটি চোখ কলকাতায় অপারেশন করা হয়। এবং এই রোগের কারনেই তার পড়াশোনায় প্রায় চার বছর গ্যাপ পড়ে। মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি তারঁ কাজিনকে বিয়ে করেন।
সে সময় তিনি ”গোপালগনঞ্জ মুসলিম সেবা সমিতি” নামে একটা সমিতির সম্পাদক ছিলেন। সেই সমিতির কাজ ছিলো, মুষ্ঠিভিক্ষার মাধ্যমে টাকা সংগ্রহ করে এলাকার গরীব মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা ও থাকা-খাওয়ার খরচ চালানো।
সেই সময়ই মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বঙ্গবন্ধুর শৈশবের স্কুল “গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুল” পরিদর্শনে আসলে তিনি সবার আগে তাদেঁর সামনে গিয়ে স্পষ্ট ও বলিষ্ঠ কন্ঠে বলেন –
“স্যার, স্কুলের ছাদ দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে। আমাদের পড়তে খুব কষ্ট হয়, গায়ের জামা কাপড় ও বই-খাতা ভিজে যায়। আপনারা ছাদ সারিয়ে দিলে আমাদের খুব উপকার হয়।”
মূলতঃ তারঁ দাবীর কারনেই তড়িঘড়ি করে ছাদ সারানো হয়। নয়তো এই দাবীর কথা সরাসরি মন্ত্রীর কাছে তুলে ধরার মতো যথেষ্ঠ সাহস ঐ স্কুলের কোন শিক্ষকেরও ছিলো না।

৯) স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধু প্রথম নিজ দায়িত্বে যে দলটি গঠন করেন, তার নাম হলো “বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক লীগ।” বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবি, পেশাজীবি, সরকারী ও বেসরকারী চাকুরে, শিক্ষক অধ্যাপক সবাইকে এক মঞ্চে নিয়ে আসার জন্য এই দলটি গঠন করেন এবং তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

১০) ৪৫ বছর আগে তারঁ নিজ বাস ভবনে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যদের হাতে সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হন। সেদিন সর্বমোট ১৬ জন, মতান্তরে ২৬ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
এরপর সারা দেশে সামরিক শাসন জারি হয়। শুরু হয় হত্যা, ক্যু ও অন্যায় অবিচারের রাজনীতি। যুদ্ধাপরাধীদের এই দেশে নাগরিকত্ব দেয়া হয়, রাজনৈতিক দল গঠনের লাইসেন্স দেয়া হয়। বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশে দেশের ঘাতকরা ম্যাসিভ পলিটিক্যাল লুটপাটে মেতে উঠে।

আমরা চাই আপনার প্রতিটা খুনীর সমুচিত সাজা হোক। পৃথিবীর মানুষ দেখবে, জাতির পিতাকে হত্যা করার সমুচিত শাস্তি পাওয়া যায় ৪৫ বছর পরে হলেও। পৃথিবীর বুকে এই দৃষ্টান্তটা স্থাপন খুব দরকার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here