বৃষ্টি নিয়ে যত কথা

0
530

নূসরাত জাহান বুলন, আমার বড় মেয়ে। প্রচণ্ডভাবে বৃষ্টি পছন্দ করে, অনেকটা আমার মতোই। মেঘ জড়ো হতে শুরু করলেই তার মন পুলকিত হয়ে ওঠে। বৃষ্টি হবে, বৃষ্টিতে ভিজবো, ভীষণ মজা হবে। তার মনের এই ভাষা যে কেউ সহজেই পড়তে পারবে। এর জন্য মনোবিজ্ঞানী হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। অতি সরল ও সাবলীল এই ভাষা।

আনন্দ-উচ্ছাসের ভাষা সবসময়ই সরল ও সাবলীল হয়, দুঃখের ভাষা হয় ভীষণ কঠিন ও জটিল। সুখী মানুষ সহজে চেনা যায় কিন্তু দুঃখী মানুষ সহজে চেনা যায় না। দুঃখ গোপনে পুষে রাখা যায়, সুখ সহজপ্রকাশ্য। ভাগাভাগি করলে সুখ বাড়ে, আর দুঃখ বাড়ে নীরবে-নিভৃতে। বৃষ্টি পড়তে শুরু করলে তার উচ্ছাসের বাধ ভেঙ্গে যায়, নাচতে শুরু করে। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ছন্দহীন নৃত্য, আহ্! ।

বৃষ্টির প্রতি তার এতো আগ্রহের অবশ্য একটি বিশেষ কারণও আছে। ওর যখন দশ পা, দ্রুত পা, বয়স তখন থেকেই আমি ওকে নিয়ে বৃষ্টিস্নান করতাম। এখন অবশ্য তার দৌড়-ঝাপ বয়স, এখন সে একাই বৃষ্টিতে ভিজতে পারে। যদিও তার মা সে সাহস তাকে দেন না। তাই সে ভীষণ বৃষ্টিকষ্টে ভোগে। মন খারাপ করে চুপটি মেরে থাকে আবার ভুলেও যায়। ব্যস্ততার কারণে না মানসিক পরিবর্তনের কারণে মেয়েকে নিয়ে আর বৃষ্টিনৃত্য হয়ে উঠে না, কেন? খুঁজে দেখিনি। তবু তার এই দুঃখ-কষ্ট ভোলার খেলা আমার ভালো লাগে না।

মেয়েদের স্বাধীনতা বুঝি এভাবেই ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়? বয়স বাড়ে, শরীর বাড়ে, বোধ-ভোগ ক্ষমতাও বাড়ে, সাথে সাথে স্বাধীনতার সাথে দুরত্বও বাড়ে, পরাধীনতার শীকলও বাড়ে। মধ্যখানে ছোট মেয়েটার বৃষ্টি উপভোগ করার হাতে খড়ি হলো না। হায়রে বেচারা! ব্যর্থতা আড়াল করে সফল সামাজিক বাবা হওয়ার প্রাণপন চেষ্টা অব্যাহত রাখি, হয়তো আমার মতো অনেকেই রাখে।

বৃষ্টিতে ভিজে বাল্যকাল সাঁতরানো কতটা মধুর তা বলে বুঝানো সম্ভব নয়। মাঝপুকুরে ডুব দিয়ে পানির নীচে থেকে বৃষ্টির শব্দ শোনার সুখ যে পায়নি সে কখনই তা উপলব্ধি করতে পারবে না। বৃষ্টিবিলাসী মন বারবার বাল্যবৃষ্টিতে ফিরে যেতে চায়। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে- আম কুড়ানো, বড়দের সাথে মাছ ধরতে যাওয়া, নদীর ঢালে পিচ্ছিল খাওয়া, বিজলির চমকে শিউড়ে ওটা, উলঙ্গ দেহে বৃষ্টির মাঝে জল-কাঁদা নৃত্য, ভোলা যায়!

বৃষ্টি নিয়ে কিছু খটকাও আছে মনে। যার জট আজো খুলতে পারি না। তাই বুলন যখন প্রশ্ন করে, বাবা বৃষ্টি কেন হয়? কিভাবে হয়? আমি মন খুলে উত্তর দিতে পারি না। ভীষণ রকমের মূর্খ মনে হয় নিজেকে। নিজের অজ্ঞতা ঢেকে রাখার অদম্য চেষ্টা করি। আমি জানি, আমি কোন উত্তর দিলে সে সেটা নিয়ে আবার পাল্টা প্রশ্ন করবে, পুরোপুরি না বুঝা পর্যন্ত সে প্রশ্ন করতেই থাকবে। যেমন-
– বাবা, বৃষ্টি কোথা থেকে হয়?
– মেঘ থেকে
– কিভাবে হয়?
– মেঘে মেঘে ধাক্কা লেগে বৃষ্টি হয়
– মেঘ কিভাবে হয়?
– সূর্যর তাপে পানি জলীয়বাষ্প হয়ে আকাশে গিয়ে জমা হয়, তাই মেঘ
– বৃষ্টি আল্লায় দেয় না?
– হুম
– আল্লার হুকুমে মিকাইল ফেরেস্তা বৃষ্টি বর্ষণ করে, তুমি জানো না?
– কে বলেছে?
– ধর্ম শিক্ষায় আছে।
– আচ্ছা
– তবে তুমি যে বললা, মেঘ থেকে বৃষ্টি হয়?
– মা চলনা আমরা বৃষ্টির গান গাই ……… আয় বৃষ্টি ঝেপে

প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাই, বুক ধরফর করে, কি বলতে কি বলবো বুঝে উঠতে পারি না। চোখের সামনে বৃষ্টি নামানি খেলা ভেসে উঠে। ভাগ্যিস সে বৃষ্টি নামানির খেলা দেখেনি এবং মাসি পিসির গানও শুনে নি। তবে সে প্রশ্ন করতো, বাবা, বৃষ্টির গান গাইলে কী বৃষ্টি আসে? সে বৃষ্টি নামানি নামাজও দেখেনি, দেখলে সে বলতো, বৃষ্টির জন্য এতো নামাজ পড়া হলো কিন্তু বৃষ্টি নামলো না কেন বাবা? না দেখেছে ভালই হয়েছে, বাঁচা গেছে…

বুলন যা খুশি ভাবুক, ওর মতো করে ওর উত্তর খুঁজে নিক, সত্য বুঝার ও খোঁজার মতো সাহসী হোক। চলুন আমরা বৃষ্টি নামানী খেলা খেলে আসি। কতই না মজা ও সম্প্রীতি ছিলো বৃষ্টি নামানি খেলায়। আল্লা-রসুল-ফেরেস্তা-দেব-দেবী কেউ বাদ পরতো না বৃষ্টি নামানীর গানে। হিন্দু-মুসলমান সবাই একসাথে কুলা ও ছেলে-মেয়ে সাজিয়ে বৃষ্টি নামানীর গান গেয়ে গেয়ে বাড়ি বাড়ি চাল-ডাল তুলে সিন্নি রেঁধে একসাথে খাওয়ার আনন্দ, ওহ! আজও জিবে জল আসে। চৈত্রের খড়ায় মাঠ ফেটে চৌচির, কৃষকমন অস্থির তবু বৃষ্টি নামানীর খেলায় তাদের চোখে-মুখে স্বপ্নসুখ ভেসে উঠত- এই বুঝি বৃষ্টি নামবে, ফসল বোনা হবে।

রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম হওয়ার পরে মসজিদে মসজিদে ফতোয় দেয়া হলো- বৃষ্টি নামানী উৎসব বেদআত। বৃষ্টির জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে হবে, মাঠে গণনামাজ পড়তে হবে। শুরু হলো বৃষ্টিনামাজ। বৃষ্টিনামাজে আনুগত্য ও উৎসাহের কোন প্রকার ঘাটতি ছিলো না। দেশব্যাপি বৃষ্টিনামাজ হলো। কোথাও কোথাও বৃষ্টিও হলো এবং সে এলাকার হুজুরের আমল ও কেরামতি প্রমাণিত হলো। পীর-ভক্তের পরিমাণও বাড়লো।

কিন্তু দিন দিন বৃষ্টির নিয়ম-নীতি বদলেই চলছে। শীতকালে যখন সাধারণত বৃষ্টি হওয়ার কথা না তখন ভরপুর বৃষ্টি হচ্ছে আবার চৈত্র-বৈশাখে যখন বৃষ্টির খুব প্রয়োজন তখন বৃষ্টি হচ্ছে না। ষড়ঋতুরও ঠিক তালগোল পাওয়া যায় না। দেখা যায়- শীতকালে শীত নেই অথচ বসন্তকালে শীতে ঠনঠন। বৃষ্টি এলেই বজ্রপাত আর ঝড়ের তান্ডব চলে। কিন্তু কেন? বৃষ্টি নামানীর গান নেই বলে? বৃষ্টিনামাজে কোন প্রকার ঘাটতি? নাকি পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা? তবে দায়ী কে?

বৃষ্টির দিনে বৃষ্টির কবিতা বা গান হবে না, এটা কী হয়! আহা! শুধু আমিই গাইতে যাবো কেন! আপনার লেখা গান বা কবিতা অথবা বৃষ্টি নিয়ে কত না গান-কবিতা তো রয়েছেই, সেখান থেকে চলুক না…..হ্যাঁ, আপনিই শুরু করুন…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here